অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙাতে ফোনের অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেকেরই

অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়া, বারবার স্নুজ দেওয়া কিংবা ঘুম ভাঙার পরও বিছানা ছাড়তে না চাওয়া—এসব এখন বেশ পরিচিত অভ্যাস। তবে জীবনযাত্রায় কিছু নিয়ম আনা গেলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িকে নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। তখন অ্যালার্ম ছাড়াও অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

শরীরের ভেতরে ২৪ ঘণ্টার একটি প্রাকৃতিক ছন্দ রয়েছে, যাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়। কখন ঘুম আসবে, কখন শরীর বিশ্রাম চাইবে এবং কখন ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নেবে—এসবের সঙ্গে এই জৈবঘড়ির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

তাই শুধু অ্যালার্মের ওপর নির্ভর না করে ঘুমের সময়, আলো, খাবার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দৈনন্দিন রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুমান

অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়তে হলে প্রথমেই পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।

সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে প্রায় সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবার ঘুমের চাহিদা এক নয়। কারও সাত ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট হতে পারে, আবার কারও শরীরের জন্য আরও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম না নিয়ে অ্যালার্ম ছাড়াই সকালে উঠে পড়ার চেষ্টা করলে বরং শরীরের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক ঘুম।

ঘুমের সময় ঠিক করুন

প্রতিদিন একেক সময় ঘুমাতে গেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি সহজে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে আসতে পারে না।

তাই প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন

একইভাবে সকালে কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন।

কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে একই রুটিন অনুসরণ করলে শরীর ধীরে ধীরে সেই সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করতে পারে।

ছুটির দিনেও রুটিন রাখুন

কর্মদিবসে ভোরে উঠে ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকার অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে এলোমেলো করে দিতে পারে।

ছুটির দিনেও ঘুমানো ও ওঠার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করাই ভালো। এতে শরীরের জৈবঘড়ি একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে।

অ্যালার্ম ছাড়া কখন স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে, তা জানার জন্য ছুটির দিনও একটি ভালো সুযোগ হতে পারে।

সকালের আলো নিন

সকালের প্রাকৃতিক আলো শরীরের জৈবঘড়িকে দিনের শুরু সম্পর্কে সংকেত দিতে সাহায্য করে।

ঘুম থেকে ওঠার পর পর্দা সরিয়ে ঘরে আলো ঢুকতে দিন। সম্ভব হলে কিছু সময় বাইরে প্রাকৃতিক আলোতে থাকুন।

সকালের আলো শরীরের ঘুম ও জাগরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে

ফলে দিনের বেলায় সতেজ থাকা এবং রাতে ঘুমানোর প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে।

রাতে আলো কমান

সকালের আলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাতে অতিরিক্ত আলো এড়িয়ে চলাও জরুরি।

ঘুমানোর সময় ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার ও শান্ত রাখা যেতে পারে। ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ঘরের আলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনলে শরীর বিশ্রামের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়।

ঘুমের আগে শান্ত হোন

ঘুমানোর আগে শরীর ও মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে বিশ্রামের অবস্থায় নিয়ে আসা ভালো।

জন্য প্রতিদিন একটি ছোট রাতের রুটিন তৈরি করা যায়। দাঁত ব্রাশ করা, হালকা বই পড়া, ত্বকের যত্ন নেওয়া, আরামদায়ক পোশাক পরা কিংবা কিছুক্ষণ শান্ত পরিবেশে বসে থাকার মতো সহজ কাজ করা যেতে পারে।

প্রতিদিন একই ধরনের রুটিন অনুসরণ করলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে এখন ঘুমের সময় ঘনিয়ে এসেছে।

বিছানায় ফোন নয়

স্মার্টফোন অনেকের রাতের ঘুমের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। নতুন নতুন ভিডিও, পোস্ট বা বার্তার কারণে মস্তিষ্কও সক্রিয় থাকে। ফলে শরীর ক্লান্ত হলেও সহজে ঘুম নাও আসতে পারে।

তাই ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন দূরে রাখা ভালো। প্রয়োজনে নোটিফিকেশন বন্ধ করা, অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা কিংবা স্ক্রিনকে গ্রেস্কেল মোডে রাখা যেতে পারে।

ঘর আরামদায়ক রাখুন

অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ঘুমানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। ঘুমের সময় শরীরের তাপমাত্রায় স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। অতিরিক্ত গরম পরিবেশ সেই প্রক্রিয়ায় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

গরমের সময় ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং পাতলা পোশাক বা চাদর ব্যবহার করা যেতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শরীর আরাম পায় এবং ঘুম বারবার ভেঙে না যায়।

ক্যাফেইন কমান

চা, কফিক্যাফেইনযুক্ত অন্যান্য পানীয় অনেকের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দিনের শেষ ভাগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে রাতে ঘুমাতে দেরি হতে পারে।

তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।

রাতের খাবার আগে খান

ঘুমানোর একেবারে আগে ভারী খাবার খেলে শরীরকে খাবার হজমের জন্য সক্রিয় থাকতে হয়। এতে ঘুমে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

তাই সম্ভব হলে ঘুমানোর অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা ভালো। একই সঙ্গে প্রতিদিন মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও শরীরের দৈনিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন

অ্যালকোহল পান করলে দ্রুত ঘুম চলে আসতে পারে—এমন ধারণা অনেকের রয়েছে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার পর ঘুমের স্বাভাবিক ধারা বিঘ্নিত হতে পারে।

ফলে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে সতেজ না লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ভালো ঘুমের জন্য অ্যালকোহলের ওপর নির্ভর না করাই ভালো।

ধীরে সময় বদলান

দীর্ঘদিনের এলোমেলো ঘুমের রুটিন এক রাতেই বদলে ফেলার চেষ্টা না করাই ভালো।

যদি প্রতিদিন অনেক দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে আনা যেতে পারে। যেমন ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার সময় প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে আগে আনার চেষ্টা করা যায়।

শরীর নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলে পরিবর্তনটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

ধৈর্য ধরে অভ্যাস করুন

অ্যালার্ম ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা কোনো তাৎক্ষণিক কৌশল নয়। শরীরের জৈবঘড়ি নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় নেয়।

তাই কয়েক দিন চেষ্টা করেই ফল না পেলে হতাশ হওয়ার দরকার নেই। পর্যাপ্ত ঘুম, নির্দিষ্ট রুটিন, সকালের আলো, রাতে কম আলো, কম স্ক্রিন ব্যবহার এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ—এসব অভ্যাস একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য শুধু অ্যালার্ম বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং এমন একটি স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাবে এবং সকালে স্বাভাবিকভাবেই জেগে ওঠার প্রবণতা তৈরি হবে।

নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে ঘুমের সময় নির্ধারণ করা এবং সেই সময়সূচি

নিয়মিত অনুসরণ করাই হতে পারে অ্যালার্মনির্ভরতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কালবার্তা নিউজ