প্রতিবেদক: কালবার্তা ডেস্ক | প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬
ভাবুন তো—রাজস্থানের কোনো গ্রামে জন্ম নেওয়া একটি শিশু কয়েক দিনের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে দিল্লির কোনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, হরিয়ানার কোনো নিঃসন্তান দম্পতির কোলে। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, বাস্তবের ভয়াবহ চিত্র। দিল্লি পুলিশ সম্প্রতি এমনই একটি আন্তঃরাজ্য শিশুপাচার চক্রের পর্দাফাঁস করেছে, যেখানে নবজাতকদের কেনাবেচা চলত মুক্তোবাজারের মতো।
কীভাবে ফাঁস হলো চক্র?
গোটা ঘটনার সূত্রপাত দিল্লির পহাড়গঞ্জ এলাকা থেকে। স্থানীয় এক বাসিন্দা পুলিশকে জানান, এক নারী নিয়মিত এলাকায় আসছেন এবং প্রতিবারই তাঁর সঙ্গে আলাদা একটি নবজাতক থাকে।
পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ওই নারীকে শনাক্ত করে—জ্যোতি ওরফে কামলেশ। এরপর এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা ভুয়া ক্রেতা সেজে তাঁর কাছে শিশু কেনার আগ্রহ দেখান। ২০ হাজার টাকা অগ্রিমে চুক্তি হয় এবং ৫ জুন কামলেশ যখন একটি নবজাতক নিয়ে হাজির হন, তখনই তাঁকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
হাসপাতালের অন্ধকার দিক
জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—পশ্চিম দিল্লির রোহিণীর ‘হিরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল’ ছিল এই চক্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু। হাসপাতালের মালিক ডা. ভিভেকি ছিলেন মূল সমন্বয়কারী।
দিল্লি পুলিশের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং জানান, “ডা. ভিভেকি জাল জন্ম সনদ ও ডেলিভারি রিপোর্ট তৈরি করে দিতেন, যাতে মনে হতো শিশুটি ওই হাসপাতালেই জন্মেছে। অনেক সময় হাসপাতালের ভেতরেই শিশু হস্তান্তরের চুক্তি সম্পন্ন হতো।”
শিশুদের দামতালিকা
তদন্তে বেরিয়ে আসে নৃশংস দামতালিকা—
| শিশুর লিঙ্গ | ক্রয়মূল্য | বিক্রয়মূল্য |
|---|---|---|
| কন্যা | প্রায় ১ লাখ | ৩-৪ লাখ টাকা |
| পুত্র | প্রায় ২ লাখ | ৬-৮ লাখ টাকা |
এক ঘটনায় দেখা গেছে, এক দম্পতি ছেলে শিশু চেয়েছিলেন কিন্তু চক্রের কাছে ছিল মেয়ে। দ্রুত বিক্রির জন্য তারা একটি ছেলে ও একটি মেয়েশিশুকে ‘যমজ’ পরিচয় দিয়ে ৯ লাখ টাকায় বিক্রি করে—যদিও তারা যমজ ছিল না।
আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্ক
এই চক্রের বিস্তৃতি ছিল বহু রাজ্যে—
- শিশু সংগ্রহ: রাজস্থানের পালি ও গুজরাটের সাবরকান্তা থেকে দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে
- বিক্রি: হরিয়ানা ও মধ্যপ্রদেশের নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে
পুলিশ গুজরাটের সাবরকান্তা থেকে সাবাভাই ঘামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে, যিনি রাজস্থান থেকে শিশু সংগ্রহ করতেন। এছাড়া হরিয়ানার পানিপত ও মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে শিশুক্রেতা দম্পতিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান অবস্থা
- উদ্ধারকৃত শিশু: ৫ জন (সবাই এক মাসের কম বয়সী)
- আনুমানিক পাচার: গত এক বছরে কমপক্ষে ৩০টি শিশু
- গ্রেপ্তার: পাচারকারী, হাসপাতাল মালিক, ক্রেতাসহ বেশ কয়েকজন
- উদ্ধারকৃত অর্থ: প্রায় ৩ লাখ রুপি
উদ্ধার হওয়া শিশুদের শিশু কল্যাণ কমিটির (CWC) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা বর্তমানে ‘পালনা’ কেন্দ্রে রয়েছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা ও পরবর্তী দত্তক প্রক্রিয়া দেখাশোনা করা হচ্ছে।
|
আরও পড়ুন:
|
সমাজের আয়না
এই ঘটনা শুধু একটি পাচারচক্রের কাহিনি নয়—এটি সমাজের নানা ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি:
- দারিদ্র্য: অর্থের লোভে মা-বাবা নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছেন
- অবৈধ চাহিদা: নিঃসন্তান দম্পতিরা আইনি দত্তকপ্রক্রিয়া এড়িয়ে সহজ পথ বেছে নিচ্ছেন
- চিকিৎসা ব্যবস্থার অপব্যবহার: হাসপাতাল নিজেই পাচারের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে
কালবার্তার ভাষ্য
শিশুপাচার মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। এই চক্র উন্মোচন দিল্লি পুলিশের জন্য প্রশংসনীয় হলেও, প্রশ্ন থেকে যায়—আর কতগুলো ‘হিরা হাসপাতাল’ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নীরবে এই অন্ধকার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে? আইনি কঠোরতা ও সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই দানবকে দমন করা সম্ভব নয়।
কালবার্তা নিউজ গভীরভাবে এই ঘটনার উপর নজর রাখবে এবং পাঠকদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন।