পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় উদযাপনে ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা: আহত ২১৯, গ্রেপ্তার ৭৮০
কালবার্তা নিউজ ডেস্ক:
ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয়ের আনন্দে যখন ফ্রান্সজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল, তখন সেই উল্লাসের একটি অংশ সহিংসতায় রূপ নিয়ে দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন (পিএসজি) চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে জয় নিশ্চিত করার পর রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে উদযাপন শুরু করেন। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ এবং পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সহিংস ঘটনাগুলোতে মোট ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে অন্তত আটজনের অবস্থা গুরুতর।
উল্লাস থেকে অস্থিরতা
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পিএসজির জয়ের খবর নিশ্চিত হওয়ার পরপরই প্যারিসের বিখ্যাত শঁজেলিজে অ্যাভিনিউ, আইফেল টাওয়ার সংলগ্ন এলাকা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সমর্থকদের ঢল নামে। ক্লাবের পতাকা, ব্যানার এবং আতশবাজি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
তবে আনন্দঘন এই পরিবেশ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়নি। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, কিছু দল দোকানের কাচ ভাঙচুর করে, রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে এবং বিভিন্ন যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরাসি পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রাজধানী প্যারিসে আগে থেকেই হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। সহিংসতা শুরু হলে অতিরিক্ত বাহিনীও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন এলাকায় জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সহিংসতার সময় ৫৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
|
আরও পড়ুন:
|
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেস বলেন, অধিকাংশ সমর্থক শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে একটি ছোট অংশের লোকজন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।
ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান
সহিংসতা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে ৭৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত চলছে।
প্যারিসের প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস, চুরি, অগ্নিসংযোগ এবং অবৈধভাবে অস্ত্র বহনের মতো অভিযোগ রয়েছে।
প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে
উদযাপনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পাশাপাশি একটি মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। প্যারিসের রিং রোডের পোর্ত মাইয়োর এলাকায় এক ২৪ বছর বয়সী যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি মোটরসাইকেল চালানোর সময় একটি কংক্রিট ব্লকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।
তবে ঘটনাটি সরাসরি ফুটবল-সংক্রান্ত সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বিজয় কুচকাওয়াজ ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা
পিএসজির ঐতিহাসিক সাফল্য উদযাপন করতে রোববার রাজধানী প্যারিসে বিজয় কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রায় ৬ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেস বলেন, “মানুষ তাদের আনন্দ প্রকাশ করবে, উদযাপন করবে—এটি স্বাভাবিক। তবে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে কিংবা সহিংসতা সৃষ্টি করে কেউ উদযাপন করতে পারে না।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। মেরিন লে পেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, একটি ফুটবল দলের বিজয়কে কেন্দ্র করে যদি দাঙ্গা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা দেশের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
|
আরও পড়ুন:
|
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহিংসতার ঘটনায় জড়িতরা প্রকৃত সমর্থক নয়; বরং তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
ফুটবলের আনন্দে সহিংসতার ছায়া
পিএসজির এই সাফল্য ক্লাবটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বহু বছর ধরে ইউরোপের সেরা ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখছিল ক্লাবটি। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় ফ্রান্সের লাখো সমর্থক আনন্দে মেতে উঠেছিলেন।
তবে সেই আনন্দের রাত সহিংসতা, ভাঙচুর এবং সংঘর্ষের কারণে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। ফরাসি প্রশাসন এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে।
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু আনন্দ-উল্লাস যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা শুধু জননিরাপত্তার জন্যই নয়, খেলাধুলার প্রকৃত চেতনাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
প্রতিবেদন: কালবার্তা নিউজ
ডেস্ক রিপোর্ট
আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন।